আজ খবর (বাংলা) নেপাল 29/08/2026: নেপালের রাসুয়া জেলায় গত বুধবার (২৬ আগস্ট) আঘাত হানা ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার নেপথ্যে ছিল বিশালাকার হিমবাহ ধ্বস —এমন তথ্যই উঠে এসেছে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে । এখনো জানা যাচ্ছে ৬০০ জনের বেশি মৃত, ২৫০০ জনের বেশি নিখোঁজ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বন্যার আগে যে কম্পন অনুভূত হয়েছিল তা ভূমিকম্প ছিল না, ছিল হিমবাহ ধ্বসের অভিঘাত। বিশেষজ্ঞদের থেকে আরো জানা গেছে নেপাল-চিন সীমান্তে ভয়াবহ হড়পা বানের নেপথ্যে রয়েছে হিমবাহ ও পাহাড়ের একটি বড় অংশ ধ্বসে পড়ার ঘটনা।

সেই ধ্বসের জেরে বরফ, পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষ নেমে এসে নদীগুলিতে প্রবল জলস্রোত তৈরি করে। এর জেরে সীমান্তবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকায় ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে। উপত্যকার উপরে প্রায় ৫,২০০ মিটার উঁচুতে হিমবাহের নিচের বড় অংশ ভেঙে শত শত মিটার নিচে উপত্যকায় আছড়ে পড়ে। বরফ-পাথর-মলবের বিশাল স্রোত নদীখাতে নেমে জলের স্তর দ্রুত বাড়িয়ে তোলে; ফলে আকস্মিক বন্যা (flash flood) তৈরি হয়। প্রাথমিকভাবে ভূমিধ্বস জনিত কম্পন সম্ভাবনা এলেও পরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ (USGS) জানায়, কম্পনটি ছিল হিমবাহ ধ্বস ও ধ্বংসাবশেষ প্রবাহের কারণে সৃষ্ট প্রায় ৫.২ ম্যাগনিটিউডের সমতুল্য কম্পন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হিমালয়ের উষ্ণায়ন, দুর্বল প্রাথমিক সতর্কতা ব্যবস্থা এবং সীমান্তজুড়ে সমন্বিত দুর্যোগ পরিকল্পনার অভাব ঝুঁকি বাড়িয়েছে। চারপাশে তখন শুধু ধ্বংসের ছবি। ভয়ঙ্কর গতিতে ছুটে আসছে কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ মেশানো জলস্রোত। একের পর এক বাড়িঘর, গাছপালা ও গাড়ি মুহূর্তের মধ্যে ভেসে যাচ্ছে। কিন্তু সেই ভয়াবহতার মাঝেও আশ্চর্যজনকভাবে নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল একটি সবুজ রঙের দোতলা বাড়ি। নেপালের ভয়াবহ হড়পা বানের মাঝে এই ‘গ্রিন হাউস’-এর দৃশ্যই এখন নজর কেড়েছে গোটা বিশ্বের। প্রবল স্রোত চারপাশের এলাকা তছনছ করে দিলেও বাড়িটি তুলনামূলকভাবে অক্ষত অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। আরও অবাক করার মতো বিষয়, ওই বাড়ির ভিতরে থাকা পরিবারের সদস্যরাও ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্য থেকে প্রাণে বেঁচে ফিরেছেন। মুহূর্তের সেই আতঙ্কের ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়তেই ‘গ্রিন হাউস’ নিয়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা।

এই বিপর্যয়ের পর বিদেশি দেশগুলির কাছ থেকে সাহায্যের প্রস্তাব এলেও সাধারণ তল্লাশি ও উদ্ধার অভিযানে বিদেশি দল প্রয়োজন নেই বলে জানিয়েছেন নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল। শিশির খানালের বক্তব্য, নেপালের সেনা, পুলিশ ও সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী নিজেদের সক্ষমতায় উদ্ধারকাজ চালাতে পারছে।নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল রয়টার্সকে জানিয়েছেন: সাধারণ সার্চ-অ্যান্ড-রেসকিউয়ের জন্য বিদেশি দলের প্রয়োজন নেই; নেপাল নিজস্ব দল দিয়ে তা পরিচালনা করতে সক্ষম।

তবে যেসব ক্ষেত্রে সরঞ্জাম ও বিশেষজ্ঞতার ঘাটতি আছে, সেখানে কারিগরি সহায়তা প্রয়োজন—যেমন: টানেলে আটকা পড়া মানুষ উদ্ধার, ধ্বংসপ্রাপ্ত সেতু-সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার, মরদেহ শনাক্তকরণ, ডিএনএ টেস্ট এবং দীর্ঘসময় মরদেহ সংরক্ষণ। এ ধরনের বিশেষায়িত সেবার জন্য নেপাল আগেই অনুরোধ পাঠিয়েছে বলেও তিনি জানান। ইতিমধ্যেই ভারত, চিন, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিশেষজ্ঞদের সাহায্য নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে নেপালের সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। ভারতের পক্ষ থেকেও সুড়ঙ্গ উদ্ধারকারী দল, মেডিক্যাল টিম ও NDRF পাঠানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। নেপাল সরকারের বক্তব্য, আন্তর্জাতিক সাহায্য প্রত্যাখ্যান করা হয়নি। দেশের নিজস্ব সক্ষমতার বাইরে যেখানে বিশেষ প্রযুক্তি বা দক্ষতার প্রয়োজন হবে, সেখানেই বিদেশি সহায়তা নেওয়া হবে। একইসঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি পুনর্গঠন ও পুনর্বাসনের ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন হতে পারে বলে জানানো হয়েছে।




