
আজ খবর (বাংলা) [খেলা] 29/08/2026 : আজ, ২৯ আগস্ট, দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে জাতীয় ক্রীড়া দিবস। ভারতের কিংবদন্তি হকি খেলোয়াড় মেজর ধ্যানচাঁদের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে প্রতি বছর এই দিনটি জাতীয় ক্রীড়া দিবস হিসেবে পালন করা হয়।
দেশের ক্রীড়াক্ষেত্রে তাঁর অসামান্য অবদানকে স্মরণ করার পাশাপাশি এই দিনটি তরুণ প্রজন্মকে খেলাধুলার প্রতি উৎসাহিত করার বার্তাও দেয়। তাঁর জন্মদিন (২৯ আগস্ট) প্রতি বছর ভারতে ‘জাতীয় ক্রীড়া দিবস’ হিসেবে পালিত হয়। এই দিনে ভারতের রাষ্ট্রপতি ক্রীড়াবিদদের জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারে (যেমন খেলরত্ন, অর্জুন পুরস্কার) ভূষিত করেন। ২০২৪ সালে ৪ জন কৃতি খেলোয়াড় খেলরত্ন পুরস্কার পান। তারা হচ্ছেন মনু ভাকের- শুটিং ডি.গুকেশ – দাবা, হরমনপ্রীত সিং- হকি, প্রবীণ কুমার প্যারা-অ্যাথলেটিক্স। মেজর ধ্যানচাঁদ খেলরত্ন পুরস্কার ভারতের সর্বোচ্চ ক্রীড়া সম্মান (পূর্বতন রাজীব গান্ধী খেলরত্ন পুরস্কার) তাঁর স্মরণে নামকরণ করা হয়েছে।

ধ্যানচাঁদ ১৯০৫ সালের ২৯শে অগাস্ট উত্তরপ্রদেশের এলাহাবাদে ( বর্তমান প্রয়াগরাজ) এক রাজপুত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। তিনি প্রথমে সাধারণ সৈনিক হিসেবে যোগদান করেন। তাঁর আসল নাম ছিল ধ্যান সিং। সেনাবাহিনীতে ডিউটি শেষ করে তিনি রাতের বেলা চাঁদের আলোয় হকি অনুশীলন করতেন। তাঁর এই নিষ্ঠা দেখে সহকর্মীরা তাঁকে ‘চাঁদ’ (হিন্দিতে যার অর্থ চন্দ্র) বলে ডাকতে শুরু করেন।

পরবর্তীতে তিনি ধ্যানচাঁদ নামেই পরিচিত হন। ধ্যানচাঁদের অন্যতম লক্ষ ছিল হকি যা তিনি সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে পূরণ করতে পেরেছিলেন। তাঁর অসাধারণ বল নিয়ন্ত্রণ, নিখুঁত ড্রিবলিং এবং গোল করার দক্ষতার কারণে তিনি বিশ্বের কাছে ‘হকির জাদুকর’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন।ধ্যানচাঁদের নেতৃত্বে ভারতীয় হকি দল বিশ্বমঞ্চে আধিপত্য বিস্তার করে এবং টানা তিনটি অলিম্পিক স্বর্ণপদক জয় করে। ১৯২৮ আমস্টারডাম অলিম্পিক: ভারত তার প্রথম অলিম্পিক সোনা জেতে। ধ্যানচাঁদ ৫টি ম্যাচে ১৪টি গোল করে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা হন।১৯৩২ লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিক: ফাইনালে ভারত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ২৪-১ গোলে পরাজিত করে, যা তৎকালীন বিশ্ব রেকর্ড ছিল।

এই ২৪টি গোলের মধ্যে ধ্যানচাঁদ ও তাঁর ভাই রূপ সিং মিলেই ১৮টি গোল করেছিলেন।১৯৩৬ বার্লিন অলিম্পিক: এই অলিম্পিকে ধ্যানচাঁদ ভারতীয় দলের অধিনায়ক ছিলেন। ফাইনালে ভারত আয়োজক দেশ জার্মানিকে ৮-১ গোলে উড়িয়ে দিয়ে সোনা জেতে। ১৯৩৬ সালের বার্লিন অলিম্পিকের ফাইনালে ধ্যানচাঁদের জাদুকরি খেলা দেখে জার্মানির একনায়ক অ্যাডলফ হিটলার এতটাই মুগ্ধ হন যে, তিনি ধ্যানচাঁদকে জার্মানির নাগরিকত্ব এবং জার্মান সেনাবাহিনীতে উচ্চ পদের অফার দেন। কিন্তু দেশপ্রেমিক ধ্যানচাঁদ অত্যন্ত বিনয়ের সাথে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেন যে তিনি কেবল ভারতের হয়েই খেলবেন। নেদারল্যান্ডসে একবার খেলার সময় তাঁর হকি স্টিকে বল এমনভাবে লেগে থাকত যে, রেফারির সন্দেহ হয় স্টিকে হয়তো কোনো আঠা বা চুম্বক লাগানো আছে।

সত্যতা যাচাই করতে তাঁর হকি স্টিকটি ভেঙে পরীক্ষা করা হয়েছিল, কিন্তু কিছুই পাওয়া যায়নি।একটি ম্যাচে বারবার নিখুঁত শট নেওয়া সত্ত্বেও গোল না হওয়ায় ধ্যানচাঁদ রেফারিকে বলেন যে গোলপোস্টের মাপ ভুল আছে। পরে মেপে দেখা যায় তিনি একদম ঠিক ছিলেন, গোলপোস্টটি আন্তর্জাতিক নিয়মের চেয়ে ছোট ছিল।১৯৫৬ সালে ভারত সরকার ধ্যানচাঁদ দেশের তৃতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘পদ্মভূষণ’ প্রদান করে।১৯৫৬ সালে সেনাবাহিনী থেকে মেজর পদমর্যাদা নিয়ে অবসর নেওয়ার পর, ১৯৭৯ সালের ৩ ডিসেম্বর এই মহান খেলোয়াড় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজুসহ শীর্ষ নেতারা ধ্যানচাঁদকে স্মরণ করে বার্তা দিয়েছেন এবং ক্রীড়া-সংস্কৃতি, ফিটনেস ও যুবপ্রতিভাকে উৎসাহিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। অনেক রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী (যেমন উত্তরপ্রদেশের সিএম যোগী আদিত্যনাথ) শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।

জাতীয় ক্রীড়া দিবসের অন্যতম লক্ষ্য হল দেশের তরুণ প্রজন্মকে খেলাধুলায় উৎসাহিত করা। শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি খেলাধুলা , দলগত মানসিকতা, নেতৃত্ব এবং অধ্যবসায়ের মতো গুণ তৈরি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই এই দিনটি শুধু একজন কিংবদন্তি খেলোয়াড়কে স্মরণ করার দিন নয়, বরং দেশের ক্রীড়া সংস্কৃতিকে আরও শক্তিশালী করারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। আজ জাতীয় ক্রীড়া দিবসে ধ্যানচাঁদের অসামান্য কীর্তিকে স্মরণ করে দেশবাসীর কাছে তাঁর জীবন হয়ে ওঠে নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। তাঁর দক্ষতা, নিষ্ঠা ও দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা আগামী দিনের খেলোয়াড়দেরও এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখাবে।



